মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানী :

# ইয়াবা উদ্ধার : ০৭/০৯/২০২৩
# টেকনাফ থানায় মামলা : ০৮/০৯/২০২৩
# চার্জশীট হয়েছে : ১৯/১০/২০২৩
# বাদী মামলার কেউ নয় মর্মে জবানবন্দি : ৩১/০৩/২০২৬
# তদন্ত করে রিপোর্ট দিতে ডিআইজি-কে বিচারকের নির্দেশ

“আমি কোন মামলা করিনি, মামলার এজাহারে থাকা স্বাক্ষর আমার নয়। এ মামলার সম্পর্কে আমি কিছুই জানিনা। কে বা কার দ্বারা অত্র মামলার এজাহার দায়ের করা হয়েছে, আমি জানিনা।” ৬০ হাজার পিচ ইয়াবা টেবলেট পাচারের মোকদ্দমায় মামলার এজাহার দায়েরকারী বাদী কক্সবাজারস্থ র‍্যাব-১৫ এর সাবেক কর্মকর্তা মো: ফিরোজ আহাম্মেদ কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ দ্বিতীয় আদালতের বিচারক মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম এর আদালতে গত ৩১ মার্চ হলফনামা মূলে এ চাঞ্চল্যকর জবানবন্দী দেন। একই আদালতের অতিরিক্ত পিপি অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আবদুর রশিদ এ তথ্য জানিয়েছেন।

মামলার নথি থেকে জানা গেছে, ২০২৩ সালের ৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৭টা ১০ মিনিটের দিকে র‍্যাব-১৫ এর ডিএডি মো: ফিরোজ আহাম্মেদের নেতৃত্বে ৫ সদস্য বিশিষ্ট একটি টিম এক অভিযান চালিয়ে কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার সাবরাং ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডস্থ পানছড়ি পাড়ার আবুল কালামের বাড়ির উঠান থেকে কবির আহম্মদের পুত্র মোঃ আব্দুল্লাহ ও মৃত আলী আহম্মদের পুত্র মোঃ আলীকে আটক করে। আটককৃতদের হাতে থাকা পলিথিনের ব্যাগ থেকে ৩০ হাজার করে মোট ৬০ হাজার পিচ ইয়াবা টেবলেট উদ্ধার করে। একইসাথে আটককৃতদের কাছ থেকে ৩টি মোবাইল সেট উদ্ধার করা হয়। এসব উদ্ধারের পর একটি জব্দ তালিকা করা হয়।এসময় বাড়ির মালিক আবুল কালাম পালিয়ে যায়।

এ ঘটনায় র‍্যাব-১৫ এর ডিএডি মো: ফিরোজ আহাম্মেদ বাদী হয়ে পরদিন ৮ সেপ্টেম্বর টেকনাফ উপজেলার সাবরাং ইউনিয়নের পানছড়ি পাড়ার কবির আহম্মদের পুত্র মোঃ আব্দুল্লাহ, মৃত আলী আহম্মদের পুত্র মোঃ আলী ধৃত এবং অলি আহমদের পুত্র আবুল কালামকে পলাতক আসামী দেখিয়ে ৩ জনের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে টেকনাফ থানায় একটি এজাহার দায়ের করেন। এজাহারটি মামলা হিসাবে তৎকালীন টেকনাফ থানার ওসি মোহাম্মদ জোবাইর সৈয়দ ও একই থানার ওসি (তদন্ত) নাছির উদ্দিন মুজমদার যৌথ স্বাক্ষরে মামলা হিসাবে জেনারেল রেজিস্ট্রারে রেকর্ড করেন। যার টেকনাফ থানা মামলা নম্বর : ২৩/২০২৩ ইংরেজি এবং জিআর মামলা নম্বর : ৬৪১/২০২৩ (টেকনাফ)। একইসাথে মামলাটি তদন্ত করার জন্য টেকনাফ থানার সাব ইন্সপেক্টর মোহাম্মদ গোলাম হক্কানীকে তদন্তকারী কর্মকর্তা (আইও) নিয়োগ করা হয়।

তদন্তকারী কর্মকর্তা (আইও) মোহাম্মদ গোলাম হক্কানী এক মাস ১১ দিন পর ২০২৩ সালের ১৯ অক্টোবর আদালতে মামলাটির চার্জশীট দাখিল করেন। চার্জশীটে ধৃত আসামী আব্দুল্লাহ, মোঃ আলী এবং আরো নতুন ৩ জন সহ মোট ৫ জন কে প্রাথমিকভাবে অভিযুক্ত করা হয়। এজাহারভূক্ত পলাতক আসামী আবুল কালামকে মামলার দায় হতে অব্যাহতি দিতে চার্জশীটে আইও আবেদন জানান। চার্জশীটটি ২০২৩ সালের ৫ নভেম্বর বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট গ্রহন করেন। বিচারের জন্য মামলাটি অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ দ্বিতীয় আদালতে প্রেরণ করা হয়। সেখানে মামলাটি সেশান ট্রায়াল মামলা হিসাবে বালামভূক্ত হয়ে নম্বর পড়ে এসটি : ৫৫/২০২৫ ইংরেজি।

২০২৫ সালের ৬ মে অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ দ্বিতীয় আদালতে মামলাটির চার্জ (অভিযোগ) গঠনের মাধ্যমে বিচারকার্য শুরু হয়। এরপর মামলাটিতে মামলা দায়েরকারী বাদী র‍্যাব-১৫ এর সাবেক কর্মকর্তা মো: ফিরোজ আহাম্মেদ সহ সংশ্লিষ্ট সকলকে আদালতে এসে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য সমন জারি করা হয়।

অতিরিক্ত পিপি অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আবদুর রশিদ জানান, সমন পেয়ে মামলার এজাহার দায়েরকারী বাদী কক্সবাজারস্থ র‍্যাব-১৫ এর সাবেক কর্মকর্তা মো: ফিরোজ আহাম্মেদ গত ৩১ মার্চ কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ দ্বিতীয় আদালতে উপস্থিত হন। তিনি সাক্ষ্য দিতে গিয়ে সাক্ষীর কাঠগড়ায় উঠে শপথ গ্রহণ করে অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ দ্বিতীয় আদালতের বিচারক মোহাম্মদ নজরুল ইসলামের কাছে বলেন, “এ মামলার আমি বাদী নই। এই মামলা সম্পর্কে আমি কিছুই জানিনা, এজাহারকারী হিসাবে আমার নাম থাকলেও এজাহারের নীচে থাকা স্বাক্ষর আমার নয়।” মামলার বাদী নিজে অকপটে এরকম জবানবন্দী দেওয়ার পর আদালতে উপস্থিত আইনজীবী সহ সকলে হতবাক হয়ে যান। সবার প্রশ্ন, র‍্যাব-১৫ এর কথিত অভিযানটি কি ভূয়া। কথিত মামলটি কিভাবে এন্ট্রি হলো, উদ্ধার করা ৬০ হাজার পিচ ইয়াবা কোত্থেকে এলো, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা (আইও) কিভাবে চার্জশীট দিলেন। এসময় মামলার আসামী মোঃ আবদুল্লাহ ও মোঃ আলী আদালতে উপস্থিত ছিলেন। তারা বলেন, ডকে উপস্থিত মামলার বাদীকে তারা ছিনেননা। একইভাবে মামলার কথিত বাদী র‍্যাব-১৫ এর সাবেক কর্মকর্তা মো: ফিরোজ আহাম্মেদও কাঠগড়ায় উপস্থিত আসামীদের ছিনেননা বলে জানান।

এ অবস্থায় বাদী মো: ফিরোজ আহাম্মেদ তার বক্তব্য স্বহস্তে লিখে হলফনামা অকারে আদালতে দাখিল করেন। হলফনামায় বাদী মো: ফিরোজ আহাম্মেদের নমুনা স্বাক্ষরও নেওয়া হয়।হলফনামাটি একই আদালতের অতিরিক্ত পিপি অ্যাডভোকেট তারেক আজিজ সত্যায়িত করেন।

এরপর বিজ্ঞ বিচারক মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম তাঁর আদেশে বলেন, বাদী মো: ফিরোজ আহাম্মেদের ডকে দাঁড়িয়ে দেওয়া বক্তব্য দ্বিধাহীন চিত্তে প্রদত্ত। আদেশে বলা হয়, মামলাটি ২০১৮ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ৩৬(১) সারণির ১১(গ)/৪১ ধারায় রুজুকৃত মামলা। মামলায় ৬০ হাজার পিচ ইয়াবা টেবলেট উদ্ধার করা হয়েছে। যার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড।

বিজ্ঞ বিচারক মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম তাঁর আদেশে আরো বলেন, “এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলায় স্বয়ং এজাহারকারীই চিহ্নিত নয়। এটি মামলার মারাত্মক ত্রুটি। কিভাবে এ মামলা রুজু হলো, মামলার এজাহারকারী কে, কারা এ এজাহার দায়ের করছে, কে এজাহার গ্রহণ করেছে, উক্ত সময়ে কোন অফিসার ইনচার্জ দায়িত্বে ছিলেন, কিভাবে তদন্তকারী কর্মকর্তা তদন্ত সম্পন্ন করলেন, কিভাবে আসামী নির্ধারিত হলো, ইত্যাদির স্বরূপ/আদ্যন্ত উদঘাটন পূর্বক এ বিচার প্রক্রিয়াকে বাঁধাগ্রস্ত করার জন্য কারা জড়িত তা উম্মোচন হওয়া আবশ্যক। তাছাড়া প্রকৃত আসামী ছেড়ে দেওয়া হয়েছে কিনা কিংবা নিরীহ মানুষকে অত্র মামলায় জড়ানো হলো কিনা তৎবিষয় সহ মামলার প্রকৃত ঘটনা কি, অত্র মামলার প্রকৃত ঘটনার রহস্য উদঘাটন, উদ্ধারকৃত ইয়াবা টেবলেটের মূল হোতা কিংবা উক্ত মাদক পাচারের সাথে কারা কারা জড়িত এবং অত্র মামলা এজাহার কার দ্বারা রুজু করা হয়েছে ও এজাহারকারীর স্বাক্ষর প্রকৃতপক্ষে জাল কিনা, তৎবিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্তের প্রয়োজনীতা রয়েছে বলে আদালতের নিকট প্রতীয়মান হয়।”

বিজ্ঞ বিচারক এ বিষয়ে একজন উর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তার (যিনি অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদমর্যাদার নিম্মে নয়) দ্বারা তদন্ত করে আগামী এক মাসের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি-কে নির্দেশ প্রদান করেন। আদালতের আদেশের কপি আইজিপি’র কাছেও প্রেরনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

প্রসঙ্গত, মামলার কথিত বাদী মো: ফিরোজ আহাম্মেদ বর্তমানে বান্দরবান জেলার রুমা উপজেলাস্থ ৯, বিজিবি-তে সুবেদার পদে কর্মরত রয়েছেন।